স্বাধীনতা দিবসের বক্তব্য ২০২৬ | ১৫ আগস্ট ২০২৬-এর বক্তব্য |Independence Day Speech in Bengali
১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট...
ভারতের আকাশে যখন স্বাধীন দেশের পতাকা উঠেছিল, তখন কোটি কোটি ভারতবাসীর চোখে ছিল আনন্দের জল।
কিন্তু সেই আনন্দের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এমন এক ইতিহাস—
যে ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় মিশে আছে রক্ত, অশ্রু আর আত্মত্যাগ।
কারণ ভারত স্বাধীন হয়েছিল ঠিকই...
কিন্তু সেই স্বাধীনতা কেউ আমাদের হাতে তুলে দেয়নি।ছিনিয়ে নিতে হয়েছিল।কেউ ফাঁসির মঞ্চে উঠে।
কেউ ব্রিটিশের গুলির সামনে বুক পেতে।
কেউ বছরের পর বছর কারাগারের অন্ধকারে থেকে।আর কেউ নিজের ঘর, পরিবার, যৌবন—সবকিছু বিসর্জন দিয়ে।এই স্বাধীনতার জন্য গর্জে উঠেছিলেন ক্ষুদিরাম বসু।মাত্র আঠারো বছর বয়সে তিনি হাসিমুখে ফাঁসির দড়ি গলায় তুলে নিয়েছিলেন।ভগৎ সিং, রাজগুরু, সুখদেব—তাঁরা জানতেন, তাঁদের সামনে মৃত্যু অপেক্ষা করছে।তবুও এক পা পিছিয়ে যাননি।কারণ তাঁদের কাছে নিজের জীবন থেকে বড় হয়ে উঠেছিল—ভারতের স্বাধীনতা।
চট্টগ্রামের মাটিতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়েছিলেন মাস্টারদা সূর্য সেন।
বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়েছিলেন বিনয়, বাদল, দীনেশ।আর শুধু পুরুষরাই নয়—
স্বাধীনতার এই সংগ্রামে ভারতীয় নারীরাও নিজেদের রক্ত দিয়ে ইতিহাস লিখেছিলেন।
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার মৃত্যুকে বেছে নিয়েছিলেন বন্দিত্বের চেয়ে।মাতঙ্গিনী হাজরা গুলিবিদ্ধ হয়েও তেরঙ্গা আঁকড়ে ধরে এগিয়ে গিয়েছিলেন।একটা সময় ছিল, যখন এই দেশের একজন তরুণের সামনে দুটো পথ ছিল—চুপ করে পরাধীনতার জীবন মেনে নেওয়া,
অথবা...
প্রতিবাদ করে নিজের জীবনটাকে বাজি রাখা।
হাজার হাজার মানুষ দ্বিতীয় পথটাই বেছে নিয়েছিলেন।
কেউ বিপ্লবের পথ নিয়েছিলেন।কেউ অহিংস আন্দোলনের পথ।
কেউ জেল খেটেছেন।কেউ নির্বাসনে গিয়েছেন।কেউ অস্ত্র হাতে লড়েছেন।
কেউ নিজের সর্বস্ব দিয়ে আন্দোলনকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।পথ আলাদা ছিল।পদ্ধতি আলাদা ছিল।
কিন্তু তাঁদের হৃদয়ে একটা স্বপ্নই জ্বলছিল—
একটা স্বাধীন ভারত|
আর সেই স্বপ্নের অন্যতম বড় নাম—
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।
যিনি ব্রিটিশদের চোখে চোখ রেখে বলেছিলেন—
“তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।”
আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈনিকদের নিয়ে তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন ভারতের স্বাধীনতার লক্ষ্যে।
তাঁর কণ্ঠে স্বাধীনতার ডাক শুনে অগণিত ভারতীয় তরুণ-তরুণী নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন।
আর অন্যদিকে—
মহাত্মা গান্ধী।
অহিংসার অস্ত্র হাতে নিয়ে তিনি সাধারণ ভারতবাসীকে স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল স্রোতে নিয়ে এসেছিলেন।
অসহযোগ আন্দোলন।
আইন অমান্য আন্দোলন।
ভারত ছাড়ো আন্দোলন।
একদিকে বিপ্লবের আগুন,
অন্যদিকে গণআন্দোলনের উত্তাল ঢেউ—
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত ধীরে ধীরে নড়ে উঠতে শুরু করেছিল।
কিন্তু এই ইতিহাস শুধু কয়েকজন মহান মানুষের ইতিহাস নয়।
এটা সেই কৃষকের ইতিহাস,
যে নিজের ঘরে খাবার না থাকলেও স্বাধীনতার আন্দোলনকে সাহায্য করেছিল।
এটা সেই ছাত্রের ইতিহাস,
যে পড়াশোনার ভবিষ্যৎ ছেড়ে আন্দোলনে নেমেছিল।
এটা সেই মায়ের ইতিহাস,
যিনি নিজের সন্তানকে হারিয়েও বলেছিলেন—
“দেশের জন্য দিয়েছি।”
এটা সেই অসংখ্য নাম না জানা সংগ্রামীর ইতিহাস,
যাঁদের ছবি আজ আমাদের কাছে নেই,
যাঁদের নাম হয়তো কোনো পাঠ্যবইয়ে নেই,
কিন্তু যাঁদের আত্মত্যাগ ছাড়া ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাস অসম্পূর্ণ।
তাঁরা জানতেন না কবে স্বাধীনতা আসবে।
তাঁরা জানতেন না তাঁরা সেই দিনটি দেখতে পাবেন কি না।
তাঁরা শুধু একটা বিশ্বাস নিয়ে লড়েছিলেন—
একদিন ভারত স্বাধীন হবেই।
আর তারপর...
এলো সেই দিন।
১৫ই আগস্ট, ১৯৪৭।
প্রায় ১৯০ বছরের পরাধীনতার অবসান ঘটল।
ভারতের আকাশে উঠল স্বাধীন দেশের পতাকা।
একটা জাতি প্রথমবারের মতো নিজের ভবিষ্যৎ নিজের হাতে তুলে নিল।
কিন্তু...
স্বাধীনতার সেই ভোরও সম্পূর্ণ আনন্দের ছিল না।
কারণ স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গেই নেমে এসেছিল—
দেশভাগের অন্ধকার।
ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে গেল ভারতবর্ষ।
লক্ষ লক্ষ মানুষ রাতারাতি ঘর হারালেন।
যে বাড়িতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কেটেছিল,
সেই বাড়ি ছেড়ে মানুষকে অজানা পথে পাড়ি দিতে হল।
পরিবার বিচ্ছিন্ন হল।
শহর বদলে গেল।
মানুষের পরিচয় বদলে গেল।
আর অনেক পথ রক্তে রঞ্জিত হল।
স্বাধীনতার আনন্দের সঙ্গে মিশে গেল অসংখ্য মানুষের কান্না।
তাই ১৫ই আগস্ট শুধু একটা উৎসবের দিন নয়।
এটা আনন্দের দিন।
এটা গর্বের দিন।
কিন্তু একই সঙ্গে—
এটা স্মরণ করার দিন।
সেই মানুষগুলোর কথা স্মরণ করার দিন,
যাঁরা নিজেদের জীবনের বিনিময়ে আমাদের হাতে তুলে দিয়ে গিয়েছিলেন সবচেয়ে বড় উপহার—
স্বাধীনতা।
কিন্তু আজ...
৭৯ বছর পরে দাঁড়িয়ে আমাদের নিজেদের কাছে একটা প্রশ্ন করতেই হয়।
যে ভারতের স্বপ্ন দেখে ক্ষুদিরাম ফাঁসির মঞ্চে উঠেছিলেন,
যে ভারতের জন্য ভগৎ সিং মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিলেন,
যে ভারতের জন্য সূর্য সেন, প্রীতিলতা, মাতঙ্গিনী হাজরার মতো মানুষ নিজেদের জীবন দিয়েছিলেন,
যে ভারতের জন্য নেতাজি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন,
যে ভারতের জন্য গান্ধীজি সারাজীবন সংগ্রাম করেছিলেন—
আমরা কি সেই ভারতটাই তৈরি করতে পেরেছি?
স্বাধীনতা কি শুধু বিদেশি শাসকের হাত থেকে মুক্ত হওয়ার নাম?
নাকি স্বাধীনতার অর্থ আরও অনেক বড়?
যদি আজও জাতের নামে মানুষকে অপমান করা হয়,
যদি ধর্মের নামে মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি হয়,
যদি দুর্নীতি একজন সাধারণ মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়,
যদি অন্যায়ের সামনে আমরা নীরব থাকি—
তাহলে নিজেদের একটা প্রশ্ন করতেই হবে...
এই কি সেই ভারত, যার স্বপ্ন দেখে তাঁরা প্রাণ দিয়েছিলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর অন্য কেউ দেবে না।
উত্তর দিতে হবে আমাদের।
কারণ স্বাধীনতা তাঁরা আমাদের দিয়ে গেছেন।
কিন্তু—
এই স্বাধীন ভারতের ভবিষ্যৎ এখন আমাদের হাতে।
আর সেই কারণেই ১৫ই আগস্ট শুধু পতাকা তোলার দিন নয়।
শুধু দেশাত্মবোধক গান গাওয়ার দিন নয়।
শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় দেশপ্রেমের পোস্ট দেওয়ার দিনও নয়।
এটা নিজেদের কাছে একটা প্রতিজ্ঞা করার দিন—
যে স্বাধীনতার জন্য এত রক্ত ঝরেছে,
সেই স্বাধীনতাকে আমরা অপচয় হতে দেব না।
যে তেরঙ্গা ওঠার জন্য এত মানুষ প্রাণ দিয়েছেন,
সেই তেরঙ্গাকে আমরা শুধু হাতে নয়—
নিজেদের হৃদয়ে বহন করব।
কারণ...
তাঁরা আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন।
এবার...
এই দেশকে কোথায় নিয়ে যাব, সেই দায়িত্ব আমাদের।


Comments
Post a Comment